ইত্তেহাদ নিউজ, ঢাকা : টেন্ডারে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে কার্যাদেশ, বিজ্ঞাপন প্রকাশে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, ভুয়া প্রাক্কলন ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ; করোনাকালীন প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অনুসন্ধান দাবি।
ইত্তেহাদ নিউজ, মাদারীপুর: পিরোজপুরের পর এবার মাদারীপুর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, কার্যাদেশ প্রদানে অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপচয় এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে একাধিক উন্নয়নকাজের কার্যাদেশ প্রদান, ডিএফপি অনুমোদনহীন পত্রিকায় গোপনে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং প্রকল্প সংশোধনের (রিভিশন) মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের নামে অনিয়মের বিষয়গুলো।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে মাদারীপুর জেলায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শতকোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরেও আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মাদারীপুর এলজিইডিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ প্রদান। সরকারি উন্নয়নকাজে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করার কথা থাকলেও একাধিক প্যাকেজে উল্টো বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, শিবচর উপজেলার দরপত্র আইডি ৫৮৯৬৪৫-এর আওতায় আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ থেকে বাবলাতলা বাজার এবং শিবচর সদর থেকে রাজৈর ভায়া উত্রাইল জিসি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায়।
কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
একই দরপত্রের আরেকটি প্যাকেজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একই প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল? দরপত্র মূল্যায়নের সময় এসব দর কীভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
শুধু সড়ক উন্নয়ন নয়, শিবচর উপজেলার সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আইডি ৫৬০৫০৫-এর বিপরীতে প্রায় ১৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার কাজের কার্যাদেশ একই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রেও প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
একাধিক প্রকল্পে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসায় দরপত্রের প্রতিযোগিতা, দরদাতাদের অংশগ্রহণ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলায় আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি কাজেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রকল্পে ‘ভুয়া প্রাক্কলন’ তৈরি করে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। কাজটি দেওয়া হয় মেসার্স কহিনুর এন্টারপ্রাইজকে।
প্রাক্কলন তৈরির সময় প্রকৃত কাজের পরিমাণ, উপকরণের বাজারমূল্য, নির্মাণ ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি হিসাব যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রকল্পটির অনুমোদিত প্রাক্কলন, কারিগরি নকশা, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং চূড়ান্ত বিল পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব হবে।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মাদারীপুর এলজিইডিতে অনিয়মের অভিযোগ শুধু কয়েকটি বড় প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। করোনাভাইরাস মহামারির সময় লকডাউন ও প্রশাসনিক নজরদারির সীমাবদ্ধতার সুযোগে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষ করে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর নথিপত্র, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ এবং বিল পরিশোধের হিসাব একসঙ্গে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।অভিযোগকারীদের বক্তব্য, ওই অর্থবছরের সার্বিক উন্নয়নকাজের নথি অনুসন্ধান করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, তা পরিষ্কার হতে পারে।
অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি ছোট ও মাঝারি প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে উল্লেখিত দরপত্রগুলোর বিবরণ হলো—
|
দরপত্র আইডি ও প্যাকেজ |
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান |
অভিযোগে উল্লেখিত অতিরিক্ত দর |
|---|---|---|
|
২৬২৯৭৫ (প্যাকেজ ২২৮) |
মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজ |
৪.৯৩% |
|
৩৩৮৩২৯ (প্যাকেজ ৩০৮) |
হাবিবা কনস্ট্রাকশন |
৪.৯৫% |
|
৩১৬০৬৯ (প্যাকেজ ২৭৮) |
মেসার্স মোহাম্মদ ফারুক মিয়া |
৪.৯৭% |
|
২৬২৯৭৬ (প্যাকেজ ২১৪) |
মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল |
৪.৯৭% |
|
৩৩৮৩৩০ (প্যাকেজ ৩০৯) |
মেসার্স আতাহার এন্টারপ্রাইজ |
৯.৪৯% |
|
৩৩৩২০০ (প্যাকেজ ২৮০) |
মেসার্স মাদবর ট্রেডার্স |
৯.৭২% |
এ ছাড়া কয়েকটি হেরিংবোন বন্ড (এইচবিবি) ও ড্রেনেজ প্রকল্পেও প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে লাখ লাখ টাকার সরকারি অর্থ অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এসব প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় তুলনামূলক কম মনে হতে পারে। কিন্তু একাধিক প্রকল্প, একই সময়কাল এবং একই ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে সম্ভাব্য অনিয়মের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে।
এলজিইডির বিশেষ সূত্রের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাবুল আখতার তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান, দরপত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের উচ্চ দর অনুমোদনের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি বলয় গড়ে উঠেছিল।
একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগসাজশের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে দরপত্রের মূল নথি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের স্বচ্ছতা।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ডিএফপি অনুমোদনহীন ও স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় গোপনে দরপত্র বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দরপত্রের তথ্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বড় অংশের কাছে যথাসময়ে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি যথাযথ মাধ্যমে প্রকাশ এবং সব যোগ্য দরদাতার অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল, পত্রিকাগুলোর অনুমোদনের অবস্থা কী ছিল এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রমাণপত্র কী রয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
বাবুল আখতার বর্তমানে একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তাঁর দায়িত্বাধীন ঢাকা বিভাগের নতুন চলমান প্রকল্পে প্রকল্প সংশোধন বা রিভিশনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় দেখিয়ে অনিয়মের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়, কাজের পরিধি, বাস্তব অগ্রগতি এবং অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মাদারীপুর এলজিইডির এসব অভিযোগ সামনে আসার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যথাযথ নয়। তবে অভিযোগগুলো যেহেতু একাধিক প্রকল্প, দরপত্র ও বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সময়ের সব দরপত্র, প্রাক্কলন অনুমোদন, কার্যাদেশ, ঠিকাদারদের বিল, কাজের পরিমাপ বই (এমবি), প্রকল্প সংশোধন এবং অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত, প্রতিযোগিতামূলক দর, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃত কাজের পরিমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমান প্রকল্প পরিচালক বাবুল আখতারের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাবুল আখতার, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হয় জনগণের করের টাকায়। ফলে দরপত্র থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মাদারীপুর এলজিইডিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকৃত অনিয়মের চিত্র সামনে আনতে এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ, ঢাকা : টেন্ডারে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে কার্যাদেশ, বিজ্ঞাপন প্রকাশে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, ভুয়া প্রাক্কলন ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ; করোনাকালীন প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অনুসন্ধান দাবি। ইত্তেহাদ নিউজ, মাদারীপুর: পিরোজপুরের পর এবার মাদারীপুর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, কার্যাদেশ প্রদানে অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপচয় এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে একাধিক উন্নয়নকাজের কার্যাদেশ প্রদান, ডিএফপি অনুমোদনহীন পত্রিকায় গোপনে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং প্রকল্প সংশোধনের (রিভিশন) মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের নামে অনিয়মের বিষয়গুলো। অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে মাদারীপুর জেলায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শতকোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরেও আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ, বাড়তি ব্যয় কয়েক কোটি টাকা মাদারীপুর এলজিইডিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ প্রদান। সরকারি উন্নয়নকাজে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করার কথা থাকলেও একাধিক প্যাকেজে উল্টো বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তথ্য অনুযায়ী, শিবচর উপজেলার দরপত্র আইডি ৫৮৯৬৪৫-এর আওতায় আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ থেকে বাবলাতলা বাজার এবং শিবচর সদর থেকে রাজৈর ভায়া উত্রাইল জিসি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। একই দরপত্রের আরেকটি প্যাকেজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একই প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল? দরপত্র মূল্যায়নের সময় এসব দর কীভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে। সেতু নির্মাণেও বাড়তি দরের অভিযোগ শুধু সড়ক উন্নয়ন নয়, শিবচর উপজেলার সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আইডি ৫৬০৫০৫-এর বিপরীতে প্রায় ১৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার কাজের কার্যাদেশ একই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। একাধিক প্রকল্পে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসায় দরপত্রের প্রতিযোগিতা, দরদাতাদের অংশগ্রহণ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ‘ভুয়া প্রাক্কলনের’ অভিযোগ মাদারীপুর সদর উপজেলায় আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি কাজেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রকল্পে ‘ভুয়া প্রাক্কলন’ তৈরি করে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। কাজটি দেওয়া হয় মেসার্স কহিনুর এন্টারপ্রাইজকে। প্রাক্কলন তৈরির সময় প্রকৃত কাজের পরিমাণ, উপকরণের বাজারমূল্য, নির্মাণ ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি হিসাব যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রকল্পটির অনুমোদিত প্রাক্কলন, কারিগরি নকশা, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং চূড়ান্ত বিল পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব হবে। করোনাকালীন সময়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মাদারীপুর এলজিইডিতে অনিয়মের অভিযোগ শুধু কয়েকটি বড় প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। করোনাভাইরাস মহামারির সময় লকডাউন ও প্রশাসনিক নজরদারির সীমাবদ্ধতার সুযোগে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর নথিপত্র, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ এবং বিল পরিশোধের হিসাব একসঙ্গে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।অভিযোগকারীদের বক্তব্য, ওই অর্থবছরের সার্বিক উন্নয়নকাজের নথি অনুসন্ধান করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, তা পরিষ্কার হতে পারে। ছোট ও মাঝারি প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি ছোট ও মাঝারি প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে উল্লেখিত দরপত্রগুলোর বিবরণ হলো— দরপত্র আইডি ও প্যাকেজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভিযোগে উল্লেখিত অতিরিক্ত দর ২৬২৯৭৫ (প্যাকেজ ২২৮) মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজ ৪.৯৩% ৩৩৮৩২৯ (প্যাকেজ ৩০৮) হাবিবা কনস্ট্রাকশন ৪.৯৫% ৩১৬০৬৯ (প্যাকেজ ২৭৮) মেসার্স মোহাম্মদ ফারুক মিয়া ৪.৯৭% ২৬২৯৭৬ (প্যাকেজ ২১৪) মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল ৪.৯৭% ৩৩৮৩৩০ (প্যাকেজ ৩০৯) মেসার্স আতাহার এন্টারপ্রাইজ ৯.৪৯% ৩৩৩২০০ (প্যাকেজ ২৮০) মেসার্স মাদবর ট্রেডার্স ৯.৭২% এ ছাড়া কয়েকটি হেরিংবোন বন্ড (এইচবিবি) ও ড্রেনেজ প্রকল্পেও প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে লাখ লাখ টাকার সরকারি অর্থ অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এসব প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় তুলনামূলক কম মনে হতে পারে। কিন্তু একাধিক প্রকল্প, একই সময়কাল এবং একই ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে সম্ভাব্য অনিয়মের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে। ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এলজিইডির বিশেষ সূত্রের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাবুল আখতার তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান, দরপত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের উচ্চ দর অনুমোদনের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি বলয় গড়ে উঠেছিল। একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগসাজশের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে দরপত্রের মূল নথি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যাচাই করা জরুরি। টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের স্বচ্ছতা। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ডিএফপি অনুমোদনহীন ও স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় গোপনে দরপত্র বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দরপত্রের তথ্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বড় অংশের কাছে যথাসময়ে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি যথাযথ মাধ্যমে প্রকাশ এবং সব যোগ্য দরদাতার অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল, পত্রিকাগুলোর অনুমোদনের অবস্থা কী ছিল এবং বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রমাণপত্র কী রয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। বর্তমান প্রকল্পের রিভিশন নিয়েও অভিযোগ বাবুল আখতার বর্তমানে একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তাঁর দায়িত্বাধীন ঢাকা বিভাগের নতুন চলমান প্রকল্পে প্রকল্প সংশোধন বা রিভিশনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় দেখিয়ে অনিয়মের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়, কাজের পরিধি, বাস্তব অগ্রগতি এবং অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুদকের তদন্তের দাবি মাদারীপুর এলজিইডির এসব অভিযোগ সামনে আসার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যথাযথ নয়। তবে অভিযোগগুলো যেহেতু একাধিক প্রকল্প, দরপত্র ও বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সময়ের সব দরপত্র, প্রাক্কলন অনুমোদন, কার্যাদেশ, ঠিকাদারদের বিল, কাজের পরিমাপ বই (এমবি), প্রকল্প সংশোধন এবং অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত, প্রতিযোগিতামূলক দর, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃত কাজের পরিমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। বক্তব্য পাওয়া যায়নি বাবুল আখতারের এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমান প্রকল্প পরিচালক বাবুল আখতারের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাবুল আখতার, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হয় জনগণের করের টাকায়। ফলে দরপত্র থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মাদারীপুর এলজিইডিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকৃত অনিয়মের চিত্র সামনে আনতে এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: মোমবাতি আর প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মহাশ্মশান। কোথাও ফুলে ফুলে সাজানো সমাধি, কোথাও জ্বলছে মোমবাতি ও প্রদীপ। ধূপের ধোঁয়া, প্রার্থনার সুর আর স্বজন হারানোর বেদনায় এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে পুরো এলাকায়। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে স্মরণ করছেন প্রয়াত মা-বাবা কিংবা প্রিয়জনকে, কেউ আবার সমাধির পাশে বসে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ছেন। প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ, তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছরের মতো এবারও বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী শ্মশান দীপাবলি উৎসব। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো প্রদীপের আলোয় এক অনন্য আবহ তৈরি হয় প্রায় দুইশ বছরের প্রাচীন এই মহাশ্মশানে। শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে নগরীর কাউনিয়া এলাকার বরিশাল মহাশ্মশানে শুরু হয় এ আয়োজন। গভীর রাত পর্যন্ত চলে উৎসব। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে প্রয়াত পূর্বপুরুষ ও স্বজনদের স্মরণে এই উৎসব উদযাপন করা হয়। দুইশ বছরের ঐতিহ্য, লাখো মানুষের স্মৃতির মিলনমেলা প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকার বরিশাল মহাশ্মশানের ইতিহাস নগরীর পত্তনেরও আগের। প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এই মহাশ্মশানে রয়েছে ৭০ হাজারেরও বেশি মঠ। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মহাশ্মশান হিসেবে পরিচিত। ১৯২৭ সাল থেকে এখানে শ্মশান দীপাবলি উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রিয়জনদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এবারও ভারত, নেপালসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ সমবেত হন। সন্ধ্যার পর সমাধিতে মোমবাতি, প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন স্বজনরা। ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সমাধি। প্রয়াত ব্যক্তির জীবদ্দশায় পছন্দের ইলিশ মাছ, পায়েসসহ বিভিন্ন খাবারও নিবেদন করেন অনেকে। কোথাও চলছে নামকীর্তন, কোথাও ধর্মীয় প্রার্থনা। আবার কোনো সমাধির পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন স্বজনরা। উৎসবের আলো-আয়োজনের মধ্যেও প্রতিটি সমাধি যেন বহন করছে একেকটি পরিবারের স্মৃতি, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের গল্প। ইতিহাসের সাক্ষী যাঁরা শায়িত এই মহাশ্মশানে শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেও বরিশাল মহাশ্মশান বিশেষভাবে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যের কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ এখানে সমাহিত রয়েছেন। এ ছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসু মাসিমাসহ বিভিন্ন সময়ে প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শেষকৃত্য এখানে সম্পন্ন হয়েছে। বাঙালি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও লেখক অশ্বিনী কুমার দত্তের চিতাভস্মও সংরক্ষিত রয়েছে এই মহাশ্মশানে। মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে তাঁর চিতাভস্ম এনে এখানে স্থাপন করা হয়। ফলে এই মহাশ্মশান কেবল শেষকৃত্যের স্থান নয়; বরং বরিশালের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। পছন্দের খাবার নিবেদন, প্রদীপ জ্বালিয়ে স্বজন স্মরণ উৎসবে আসা জয়দেব সাহা বলেন, প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতিবছর তাঁরা এখানে আসেন। জীবিত অবস্থায় প্রিয়জনেরা যেসব খাবার পছন্দ করতেন, সেসব খাবারও সমাধিতে নিবেদন করা হয়। এরপর প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁদের জন্য প্রার্থনা করেন। উজ্জ্বল দাস জানান, দীপাবলি উৎসবের আগে মৃত স্বজনদের সমাধি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রং করিয়েছেন। উৎসবের দিন মোমবাতি ও প্রদীপ দিয়ে সাজিয়েছেন সমাধিগুলো। যেসব সমাধিতে স্বজনেরা আসেন না, সেখানেও তিনি মোমবাতি জ্বালিয়েছেন। পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রতিবছরই এখানে আসেন বলে জানান তিনি। নিরাপত্তায় ৩০০ পুলিশ সদস্য, সিসি ক্যামেরায় নজরদারি মহাশ্মশান পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, প্রতিবছর দীপাবলি উপলক্ষে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় এবং পুরোনো স্মৃতি ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে আয়োজনটি পরিণত হয় এক বৃহৎ মিলনমেলায়। বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত বলেন, শনিবার বিকেল থেকেই দর্শনার্থীদের সমাগম শুরু হয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন। উৎসবের আগে পুরো মহাশ্মশান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে পুরো এলাকায় আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। শ্মশান দীপাবলি ও পরদিন কালীমাতার পূজা উপলক্ষে আয়োজনে কোনো কমতি রাখা হয়নি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার জানান, শ্মশান দীপাবলির নিরাপত্তায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি-৮-এর সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, সাদা পোশাকে পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নজরদারি করছেন। নির্ধারিত স্থানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফুট প্যাট্রোল পরিচালনা করা হচ্ছে। হাজারো প্রদীপের আলোয় রাতভর আলোকিত থাকে বরিশাল মহাশ্মশান। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এই আয়োজন হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মরণ করার এক আবেগঘন উপলক্ষ। জীবিতদের কাছে প্রিয়জনেরা অনুপস্থিত হলেও তাঁদের স্মৃতি যে মুছে যায় না, শ্মশান দীপাবলির প্রতিটি প্রদীপ যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুল আলোচিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল, তখন সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে ঘটে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সাময়িক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন এক অধ্যায়। প্রতি বছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হয়। দিবসটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন রয়েছে নানা আয়োজন, তেমনি এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, তাৎপর্য ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও রয়েছে আলোচনা। ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় চরম অস্থিরতা। রাষ্ট্রক্ষমতা, সামরিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। সেই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন। কী ঘটেছিল ৭ নভেম্বরের ভোরে? ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ওইদিন ভোরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সৈনিকদের মধ্যে অভ্যুত্থানের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। রেডিওতে ভেসে আসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ। তিনি বলেন, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’ এরপর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার এবং নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানান। তৎকালীন দৈনিক বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্নের অবসান হয়েছে এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। সেদিন রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। পথে পথে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলিঙ্গন এবং উচ্ছ্বাসের দৃশ্য দেখা যায়। সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীর ট্যাংকের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেন। রাজধানীর বাইরেও দেশের বিভিন্ন শহর, নগর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়া। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিএনপি ও দলটির সমমনা রাজনৈতিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচনা করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ওই দিনের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান তাঁর কিছু স্মৃতি কিছু কথা বইয়ে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায়, সেদিন গোটা দেশজুড়ে সৈনিক ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব উত্থান ঘটেছিল। আর সেই অভ্যুত্থানের উত্তাল তরঙ্গের মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। ফলে দিনটির তাৎপর্য বুঝতে হলে তৎকালীন সামরিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ঘিরে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপনে দেশব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে সাধারণ ছুটি পালিত হবে। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। সরকারি ও রাজনৈতিক পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিএনপির সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৭ নভেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করবে দলটি। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শোভাযাত্রা উদ্বোধনের কথা রয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শোভাযাত্রা শুরু হবে। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি নেতারা বলেন, অতীতে একটি রাজনৈতিক দল দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় অস্বীকার করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল সাধারণ মানুষের ওপর। তাঁদের দাবি, ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশ সংকট থেকে রক্ষা পেয়েছিল এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। বিএনপি নেতারা আরও বলেন, যখনই দেশ একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কবলে পড়েছে, তখনই সচেতন জনগণ রাজপথে নেমে এসেছে। এর উদাহরণ হিসেবে তাঁরা ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করেন। ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা? বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে বলে বিএনপি ও সমর্থকরা মনে করেন। অন্যদিকে, ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য ১৯৭৫ সালের সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা, বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনগুলোও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। সব মিলিয়ে, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন একটি দিন, যার প্রভাব ও ব্যাখ্যা কয়েক দশক পেরিয়েও জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।