ঘুস ছাড়া কাজ করেন না রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ

মামুনুর রশীদ নোমানী :
টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। ঠিকাদাররা কাজ করলেও অর্থ না দিলে বিল হয় না। এমনকি টাকা না দিলে ঠিকাদারদের জামানতও ফেরত পান না। জামানত ফেরত পেতেও দিতে হয় ১৫ পার্সেন্ট। এ হচ্ছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের ফিরিস্তি। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, পতিত আওয়ামী লীগের নেতাদের পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করেন না এ অভিজিৎ মজুমদার।
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুদকের গনশুনানীতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিযেছিল আব্দুল হাকিম নামে এক ব্যক্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজাপুরের মডেল মসজিদ থেকে ভায়া মঠবাড়ি ইউপি অফিস হয়ে নাপিতেরহাট পর্যন্ত ৩১ মিটার দৈর্ঘ্যের দু’টি আরসিসি গার্ডার ব্রিজের জন্য চার কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার ১৬৪ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। দেড় বছরেও কাজটি শুরু হয়নি। আরো একাধিক কাজ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রকৌশলীর গাফলতির কারণেই ব্রিজের কাজ শুরু হচ্ছে না।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আক্কেল মিয়ার বাজারসংলগ্ন আয়রন ব্রিজের কয়েকটি লোহার পাত ও নাট-বল্টু খুলে নিয়ে গেছে চোরচক্র। ওই সড়ক দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল না করলেও যাত্রীবাহী অটোরিকশা ও মালবাহী ট্রলি যাতায়াত করে। তিন বছর আগে মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিলো। তবে ব্রিজটি সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণের বিষয়ে এলাকার কেউই কিছু জানেন না।
হাশেমের পুল খ্যাত ব্রিজটির বিষয়ে (কালভার্ট) এলাকার লোকজন বলেন, এ ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে ২০ বছরও হয়নি; মানও ভালো রয়েছে। এটি ভেঙে নতুন ব্রিজ করার কোনো প্রক্রিয়া আছে কি না? সে বিষয়ে এলাকাবাসী কিছুই জানেন না। তারা মনে করেন, ব্রিজটি অন্তত আরো ২০ বছরে কিছুই হবেনা- তাই ভেঙে নতুন ব্রিজ করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে কিছুটা সংস্কার করা যেতে পারে।
এ ছাড়াও রাজাপুর উপজেলার মোল্লারহাট-শ্রীমন্তকাঠি এবং পিংড়ি ভায়া বলারজোড় হাঁট জিসি সড়কের ৯ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ সম্পন্ন হলেও ব্রিজের দুইপাশের নামার পথ (এপ্রোচ) নির্মাণ করা হয়নি। বছরখানেক ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখায় জনদুর্ভোগ লাঘবের বিপরীতে আরো কয়েকগুণ বেড়েছে। এপ্রোচ নির্মাণ না হওয়ায় ওই সড়কে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। ব্রিজটি নির্মাণে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে এক কোটি ৪০ লাখ ৩০ হাজার ৫৯১ টাকা। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
রাজাপুর উপজেলার কাটাখালি হাট ভায়া পশ্চিম গালুয়া-দুর্গাপুর এলাকার খালের উপরে ২২ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩.৭০ মিটার প্রস্থ, আঙ্গারিয়া সিরাজ মেম্বারের বাড়ি হতে গালুয়া-কৈবর্তখালী হয়ে ফকিরহাট এলাকার খালের উপরে ২০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩.৭০ মিটার প্রস্থ, উপজেলার কাটাখালি হাট ভায়া ভান্ডারিয়া সীমান্ত শাহজাহান মিয়ার বাড়ির সামনে এলাকার খালের উপরে ২০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩.৭০মিটার প্রস্থ, উপজেলার কাঁচারীবাড়ি হতে কাটাখালি হাট পর্যন্ত লতিফ সিকদারের বাড়ি এলাকার খালের উপরে ২০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩.৭০ মিটার প্রস্থ আয়রন ব্রিজ নির্মাণের বরাদ্দও কার্যাদেশে দেয়া হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দুই কোটি এক লাখ ৮৬ হাজার ৪২৪ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দেড় বছরে তিনটি পাকা ব্রিজ নির্মাণ কাজ হয়েছে ১০ শতাংশ। পুরাতন ব্রিজগুলো ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে। এলাকাবাসীর যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে এ কষ্ট আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

অভিজিৎ মজুমদার এখনো রাজাপুর এলজিইডির ওয়েবসাইট থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট হাসিনার ছবি রেখে দিয়েছেন।ওয়েব সাইট থেকে স্কিনশর্টের মাধ্যমে নেয়া চিত্র।
ঝালকাঠি জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি ইলিয়াছ সিকদার ফরহাদ বলেন, উন্নয়নমূলক কাজ করা হয় মানুষের দুর্ভোগ দূর করার জন্য। এলাকার বৃহত্তর জনস্বার্থে মানুষকে শান্তি দেয়ার জন্য। কিন্তু সেই কাজ শুরু করে ফেলে রাখা, অর্ধেক সম্পন্ন করা অথবা শেষ করে এপ্রোচ (ঢাল) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না করা- এতে মানুষের দুর্ভোগ আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার টাকা ছাড়া ওয়ার্ক অর্ডার, কাজের বিল, জামানত ফেরতসহ কোনো কাজের ফাইলেই হাত দেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার জানায়, ওয়ার্ক অর্ডারে ৩ পার্সেন্ট থেকে ৫ পার্সেন্ট, বিল করাতে ৫ পার্সেন্ট থেকে ৭ পার্সেন্ট, জামানতের টাকা তুলতে ৩ পার্সেন্ট টাকা তাকে দিতে হয়।
এ ছাড়াও নিম্নমানের কাজের স্বীকৃতি দিয়ে তিনি হাতিয়ে নেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। প্রায়ই তিনি থাকেন অফিসের বাইরে। সকালে কখনো ১২টার আগে অফিসে আসেন না। জিজ্ঞেস করলে বলে সাইডে ছিলাম। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তিনি থাকেন রাজাপুরের বাইরে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এখনো আওয়ামী লীগের নেতাদের পরামর্শেই চলেন তিনি। সম্প্রতি একটি খাল খনন নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন আওয়ামী লীগের নেতাদের দিয়ে, যা নিয়ে এলাকায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা অভিজিৎ মজিমদারের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, তিনি রাজাপুরের প্রকৌশলী হলেও অধিকাংশ সময় কাটান ঝালকাঠি জেলা শহরে। এছাড়া তার সাথে সাবেক এক ইউএনওর সাথে দ্বন্ধের কারনে মুখ থুবড়ে পড়েছিল তৎকালীন সময়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড।
এদিকে, ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত দুদকের গনশুনানীতে অভিযোগ দিয়েছিল , রাজাপুরের মৃত মোকলেস হাওলাদারের পুত্র আব্দুল হাকিম হাওলাদার। দুদকে দেয়া অভিযোগে আব্দুল হাকিম উল্লেখ করেন,
ব্রীজ হওয়ার দরুন যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।রাজাপুর আদর্শ পাড়া লেবুবুনিয়া প্রবেশ মূলে এলজিইডি কর্তৃক নির্মাণকৃত ব্রীজের কারণে। আমাদের যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এলজিইডি হতে ইস্টিমেট কালীন আমাদের আশ্বস্ত করেছিলো যে, আমাদের যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করে দিবে কিন্তু তা দেয়নি। বারবার থানা ইঞ্জিনিয়ারকে লিখিতভাবে জানানো সত্ত্বেও আমরা সমাধান পাইনি। বর্তমানে আমাদের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ।
দুদক গনশুনানীতে ডেকে নেয় রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারকে।অদৃশ্য কারনে দুদকের হাত থেকে বেচেঁ যায় অভিজিৎ মজুমদার। দুদকে অভিযোগ দেয়ার কারনে আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে এক সনাতন ধর্মের লোক দিয়ে মামলাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানী করছে অভিজিৎ মজুমদার।
এলজিইডির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টিএ বিল আত্মসাৎ :
রাজাপুর উপজেলা হিসাবরক্ষন অফিসের সাথে যোগসাজসে অভিজিৎ মজুমদার তার ব্যাংক হিসেবে টিএ বিলের সকল অর্থ নিয়ে গেছেন।
রাজাপুর উপজেলা এলজিইডি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজের প্রয়োজনে ভ্রমণের খরচ বাবদ প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার জন্য টিএ বিল দাখিল করেন। টিএ বিল পাশ হলেও কাউকে তিনি সেই বিল প্রদান করেন নি।টিএ বিল না পাওয়ায় রাজাপুর উপজেলা এলজিইডি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অভিজিৎ এর ওপর ক্ষুব্দ।সুত্র জানায়,কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টিএ বিল আত্মসাতের জন্য দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নিজ একাউন্টে নিয়ে গেছেন।অথচ এলজিইডির অন্য সকল উপজেলায় টিএ বিল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিজ নিজ একাউন্টে চলে গেছে।এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশিত হলে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টিএ বিলের অর্থ ফেরৎ দেন অভিজিৎ মজুমদার।
এসব বিষয়ে অভিজিৎ মজুমদার বলেন,আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হযেছে তা অসত্য।তবে দুদকের গনশুনানীতে অভিযোগের কথা স্বিকার করে বলেন,আমাকে দুদক গনশুনানীতে ডেকেছিল।
উল্লেখ্য,রাজাপুর এলজিইডিতে উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবর্তীতে বিভিন্ন উপজেলার এলজিইডি কর্মকর্তাদের বদলী করা হলেও ঘুসের বিনিময়ে রাজাপুরে এখনো বহাল তবিয়তে অভিজিৎ মজুমদার।
(আগামী পর্বে থাকছে অভিজিৎ মজুমদারের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তারিত সংবাদ)
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ, ছবি ,অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। ভিজিট করুন : http://www.etihad.news
* অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইত্তেহাদ নিউজে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায় ।



