
অনিয়ম যেখানে নিয়মে পরিনত, অসভ্যতাই যেখানে সভ্যতা, নোংড়াই যেখানে পরিচ্ছন্নতা! রোগী, স্বজন যেখানে জিম্মি, বর্তমান আলোর পৃথিবীতে এক ভয়ানক অন্ধকার জগতের নাম দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রোগী ভর্তি থেকে শুরু হয় নানান রকম হয়রানী আর বিরম্বনা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জরুরি বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ক্যাজুয়ালটি বিভাগটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। জরুরি বিভাগ থেকে আহত রোগীদের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে না পাঠিয়ে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণীর দালাল চক্রের সঙ্গে জরুরি বিভাগের কর্মচারীদের সিন্ডিকেট রয়েছে। কমিশনের বিনিময়ে জরুরি বিভাগ থেকে রোগী ভাগিয়ে তারা প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে নিয়ে যায়।কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারীতা, কর্তব্যে অবহেলার কারনে জটিল ধাধায় পরে যায় আগত সাধারন রোগী ও স্বজনরা। আয়া বুয়াদের দাপট আর আচরণ এতটাই জঘন্য। এমনকি ঝাড়ু নিয়েও আক্রমন করতে দেখা গেছে স্বজনদের উপর। কেউ প্রতিবাদ করলেই যেনো তাকে বিপদে পরতে হয়, ভিমরুলের দলের মত সব দলবদ্ধ হয়ে ঝাপিয়ে পরে। এতো গেলো আয়া বুয়া ক্লিনারদের কথা।সিস্টার নার্স আর ডাক্তার, তারাতো বাংলার নবাব। কোন বিষয় কথা বলতে গেলেই ধমকের সুরে কথা বেড়িয়ে আসে তাদের মুখ থেকে। রোগী যখন সংকটময় অবস্থা তখন দশবার ডেকেও তাদের পাওয়া যায়না। তাদের অবহেলার কারনে শিশু মারা গেছে নবজাতক শিশু ওয়ার্ডে। স্বজনদের অভিয়োগ ডাক্তার যদি একটু কেয়ার করত তবে হয়ত শিশু তিনটি বেচে যেতো। এর কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে নাজেহাল করে দেয় তারা। সাংবাদিক পরিচয় দিলে, হুমকী দিয়ে বলা হয়, এটা সরকারী হাসপাতাল, ডাক্তারদের ক্ষমতা অনেক, আপনি যা পারেন করেন গিয়ে। শিক্ষিত ডাক্তারদের এমন অশালীন দৃষ্টতাপূর্ণ আচরনে হতবাগ হয়ে পরে উপস্হিত জনতা। পরিচ্ছন্নতার কথা আর কি বলব, এক কথায় সমগ্র হাসপাতালটি একটি নোংড়া দূর্গন্ধময় ভুবন। বেশিরভাগ বাথরুমের নেই কোন দরজা, পানি ব্যাবহারের ব্যবস্থাও নেই বেশিরভাগ বাথরুমে, নানা অব্যাবস্থাপণা, অনিয়নম আর সেচ্ছাচারীতায় এমন বৃহত্তর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন কতিপয় অমানুষ আর হায়েনার রাজ্যে পরিনত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবী, লাখো মানুষের সেবায় নিয়োজিত এই মহা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নিয়ম ও সভ্য আচরণে ফিরে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

সরকারি ডিউটি রেখে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত ক্লিনিকে সময় দেন। এর ফলে সরকারি চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা পড়েন চরম ভোগান্তি ও বিড়ম্বনায়।

বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল হাসপাতালের মানসিক বিভাগের পাশের এ খোলা জায়গাতে চিকিৎসা বর্জ্য ফেলছে কর্তৃপক্ষ। রাতে সিটি করপোরেশন এসব ময়লা অপসারণ করলেও দিনভর পাখি, কুকুর, বিড়াল এসব বর্জ্য চারদিকে ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করছে। হাসপাতালের মূল ভবনের পাশেই ময়লার ভাগাড় গড়ে তোলায় চিকিৎসা নিতে এসে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।রোগীর স্বজনরা জানান, মানসিক বিভাগের পাশে ময়লার ভাগাড় করায় কোনোভাবেই চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো রোগীর সঙ্গে এসে নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানান তারা।এদিকে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দুদফা চিঠি ও বৈঠক করেও কোন সুরাহা করতে পারেনি পরিবেশ অধিদফতর।বরিশাল জেলা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক বলেন,‘দ্রুত এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমরা বারবার তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিষয়টি দুঃখজনক।’তবে দ্রুত ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতালে ২ টি জায়গা নির্ধারণ করেছি। দ্রুত এই দুই জায়গায় ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’১৯৬৮ সালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর ৫৫ বছরেও তৈরি করা হয়নি ডাম্পিং স্টেশন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অডিটোরিয়ামে এক আলোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হাসপাতাল নোংরা থাকবে এবং মানুষ চিকিৎসা সেবা পাবে না-এটা আর গ্রহণ করতে রাজি নই। যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের কাছ থেকে কাজ বুঝে নিতে চাই– যদি না পারেন তবে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে।’
হাসপাতালটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অন্য হাসপাতালের তুলনায় এই হাসপাতাল পিছিয়ে আছে। হাসপাতালের বাইরে খারাপ অবস্থা। এখানে চারিদিকে ফুলের গাছ দিয়ে ভরিয়ে দিতে হবে, যাতে মানুষের প্রথম দেখায় ভালো লাগে। এখানে চারিদিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে, হাসপাতালে শীতের মধ্যে মানুষকে শুয়ে থাকতে দেখেছি। এরপরে যখন আসবো এসবের উন্নতি দেখতে চাই।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই হাসপাতালের (শেবাচিম) আগে ক্যান্সারসহ বিশেষায়িত হাসপাতালের কাজ দেখতে গিয়েছিলাম, সেগুলোও অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কাজ পিছিয়ে আছে। যারা ঠিকাদার রয়েছেন তাদের বলতে চাই, যে টুকু পিছিয়ে পড়েছে সেটি যেন দ্রুত পূরণ করা হয়, তা নাহলে পেনাল্টিতে পড়তে হবে।’
জানা গেছে, ১৯৭০ সালের ২০ নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কার্যক্রম শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে সব ধরনের রোগের চিকিৎসার ইনডোর-আউটডোর সেবা থাকতে হবে। কিন্তু শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চিকিৎসক ও স্থান স্বল্পতার কারণে একাধিক রোগের ইনডোর-আউটডোর সেবা কার্যক্রম চালু ছিল না। বিশেষ করে কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) চিকিৎসার বহির্বিভাগ চালু না থাকায় গরিব ও সাধারণ রোগীরা প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এ অবস্থায় ২০১৫ জানুয়ারিতে এক সভায় স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কমিটির সভাপতি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ জরুরি ভিত্তিতে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগ বহির্বিভাগ চালুর নির্দেশ দেন। প্রতিষ্ঠার ৫১ বছর পর ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ভাস্কুলার সার্জারি, কার্ডিওলজি, ইউরোলজি ও গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি বহিঃ বিভাগের কার্যক্রম।
শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের বহির্বিভাগে মাকে চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত।১৯ জুন বেলা ১১টার দিকে শেবাচিমের নিচতলায় ববি শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রী র্যাগিংয়ের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় কলেজ অধ্যক্ষের বিচার চাইলেও বিচার পাননি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। বরং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বক্তব্য নেয়ায় সাংবাদিকদের পিটিয়েছেন কলেজের শিক্ষকরা। ২৪ আগস্ট ওই ছাত্রী র্যাগিংয়ের শিকার হন। এ ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহের জন্য শনিবার ২৬আগস্ট সাংবাদিকরা কলেজে গেলে হামলার শিকার হন।
কলেজ অধ্যক্ষের কাছে র্যাগিংয়ের বিচার চাইতে যান ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। এদিন সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার শাকিল মাহমুদ, চিত্র সাংবাদিক সুমন হাসানসহ চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের স্টাফ রিপোর্টার কাওছার হোসেন রানা, বাংলা নিউজ ২৪ এর রিপোর্টার মুসফিক সৌরভ, এশিয়ান টেলিভিশনের রিপোর্টার ফিরোজ মোস্তাফা যান তথ্য সংগ্রহে। এ সময় ভুক্তভোগীর বক্তব্য নেয়ায় সাংবাদিকদের পিটিয়েছেন কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক ডা. সৈয়দ বাকী বিল্লাহ ও প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সাহা।

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবামেক) হাসপাতালের ছাত্রী হলে র্যাগিং ও সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহাকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।রবিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে এই কমিটি গঠন করা হয় বলে জানান উপাধ্যক্ষ জিএম নাজিমুল হক।কলেজের অধ্যক্ষ ডা. ফয়জুল বাশার ঘটনা তদন্তে ৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেন। যার প্রধান করা হয়েছে অধ্যাপক উত্তম কুমার সাহাকে। কমিটির অন্য ৩ সদস্য হলেন- অভিযুক্ত প্রবীর কুমার সাহা, প্রভাষক আনিকা ইসলাম ও জহিরুল ইসলাম।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যাসংকট সত্ত্বেও নিচতলায় একটি বেসরকারি ব্যাংককে কক্ষ ভাড়া দেয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। আপন ছোট ভাইকে ব্যাংকটির চাকরিতে স্থায়ী করতে এ কাজ করেছেন তিনি।হাসপাতালে শয্যাসংকটে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। বারান্দা, শৌচাগারসহ কোথাও নেই একটুও হাঁটার জায়গা। এমন দুর্ভোগের মধ্যেই হাসপাতালের নিচতলায় একটি বেসরকারি ব্যাংককে ভাড়া দেয়া হয়েছে কক্ষবরিশাল নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলনের সদস্যসচিব এনায়েত হোসেন শিপলু বলেন, ‘হাসপাতালের পরিচালক তার ছোট ভাইকে চাকরি দেয়ার সুবাদে হাসপাতালের ভেতর ব্যাংক ভাড়া দিয়েছে। এমন অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। হাসপাতালের বাইরে অনেক খালি ভবন রয়েছে। সেখানে ব্যাংক স্থাপন হলেও চলত। হাসপাতালের মেডিসিন ভবনের ভেতর ব্যাংকটি অবিলম্বে সরিয়ে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি নিয়ম মেনে হাসপাতালের নিচতলায় এক হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা ভাড়া দেয়া হয়েছে। প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া আসে সেখান থেকে। আমি কোনো দুর্নীতি করিনি।এ বিষয়ে ভাড়া নেয়া বেসরকারি ব্যাংকটির কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিমাসের ভাড়া নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দিয়ে দেয়া হয়। হাসপাতালের ভেতরে ব্যাংকটি খোলা হয়েছে রোগীদের সেবা দেয়ার জন্যই। আমরা চাই রোগীরা নিরাপদে টাকা-পয়সা লেনদেন করুক।ডা. সাইফুল ইসলামের ছোট ভাই মনির হোসেন বলেন, ‘আমি নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমার চাকরির বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আরও ভালো জানে।

মধ্যরাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রোগী ও স্বজনদের দাবি, সেবা না দিয়ে হাসপাতালের কক্ষে ঘুমিয়ে থাকেন দায়িত্বরতরা। ডাকাডাকি করেও প্রয়োজনে পাশে পান না নার্সদের। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার দায়সারা জবাব হাসপাতাল প্রশাসনের।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে রাতে বিছানার চাদর টাঙিয়ে ঘুমাচ্ছেন নার্সরা। দরজার সামনে অপেক্ষায় রোগী ও তাদের স্বজনরা। শুধু মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডেই নয়, এমন অবস্থা হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ডাকাডাকি করেও প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না নার্সদের। রাতে সেবা চাইতে গেলে উল্টো খারাপ ব্যবহার করেন তারা।রোগীরা জানান, ঠিকমতো নার্সরা আসেন না। সেবা তো দূরে থাক, প্রয়োজনের সময় অনুরোধ করেও আনা যায় না তাদের। ডাক্তার আর প্রশাসনের কাছে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি বলে দাবি তাদের। তবে এসব বিষয় অস্বীকার করেন নার্সরা। তারা জানান, রোগীরা যখন আসে তখনই সেবা দেয়া হয় তাদের। পাশাপাশি রাতে রোটেশন অনুযায়ী সেবা দেয়া হয় রোগীদের। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দৈনিক গড়ে রোগী ভর্তি থাকেন ২ হাজার। আর তাদের সেবা দিতে বর্তমানে নার্স আছেন ৯৪৬ জন।

এক বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের সব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেশিন। একে তো চলছে তীব্র দাবদাহ, তার ওপর মাত্র ৪৩টি শয্যার বিপরীতে রোগী থাকেন প্রায় দ্বিগুণ। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, দফায় দফায় চিঠি চালাচালি করেও সমাধান মিলছে না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, কার্ডিওলজি বিভাগে তারা বেড না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ওয়ার্ডে শয্যার চেয়ে রোগী বেশি। বাইরে প্রচণ্ড গরম। ভেতরে মানুষ ঠাসাঠাসি। এসি না থাকায় তাদের খুব সমস্যা হচ্ছে।
চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সিসিইউ ও পিসিসিউতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। কার্ডিওলজি বিভাগে শয্যা সংখ্যা ৪৩টি। কিন্তু রোগী প্রায় দ্বিগুণ। মেঝেতে শুয়েও নিতে হয় চিকিৎসা।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সিসিইউতে থাকা ১০টি, পিসিসিউর ৮টি, ইকো ও ইটিটি কক্ষে ১টি করে মোট ২০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেশিনের সবই বিকল। দফায় দফায় চিঠি চালাচালি করেও সমাধান মিলেনি বলে জানান পরিচালক।বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে থাকা ২০টি এয়ার কন্ডিশনই ব্যবহার অনুপযোগী। বিভিন্ন দফতরে লিখিত জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।’ তবে দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের দাবি, রোগীদের কষ্ট লাঘবে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া হবে। বরিশাল গণপূর্ত মেডিকেল কলেজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যার সমাধান করা হবে। যাতে করে রোগী ও স্বজনদের কষ্ট লাঘব হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে দৈনিক গড়ে ২ হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। আর প্রতিদিন বহির্বিভাগে সেবা নেন তিন হাজার রোগী।

প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছরেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়নি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অত্যাধুনিকসব যন্ত্রপাতি থাকলেও অধিকাংশই বিকল। ভোগান্তির অপর নাম শয্যা সংকট। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও সমস্যার সমাধান না পাওয়ার আক্ষেপ খোদ হাসপাতালের পরিচালকের। শয্যা সংকটে মেঝেতেই চলছে চিকিৎসাসেবা। ৫৪ বছর আগে নির্মাণ করা হাসপাতালটির ভবনের অবস্থাও জরাজীর্ণ। খসে পড়ছে পলেস্তারা। পানি সংকট ভোগান্তি আরও বাড়িয়েছে। রোগীদের সঙ্গে খারাপ আচরণেরও অভিযোগ রয়েছে নার্সসহ হাসপাতালের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।দীর্ঘদিন ধরে বিকল এমআরআই, সিটিস্ক্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। তাই স্বাস্থ্যের যেকোনো পরীক্ষায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোই ভরসা রোগীদের।বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় ইমার্জেন্সি মোকাবিলা করতে পারি না। তবে প্যাথলজি বিভাগে আমরা দুই শিফট চালু করেছি।’ সংকটের বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েও কোনো সমাধান মিলছে না বলে আক্ষেপ করেন হাসপাতাল পরিচালক।

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবামেক) হাসপাতালে জমে ওঠেছে ট্রলির ব্যবসা। কোনো রোগী টাকা ছাড়া ট্রলিতে উঠতে পারে না। এছাড়া প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির কথা জানে বলেও সরল স্বীকারোক্তি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। হাসপাতালে ঢুকতেই ইমারজেন্সি চত্বরে দেখা যায় বেশ কয়েকটা ট্রলি। আর এখানেই ঝগড়া-বিবাদ। হাসপাতালে ট্রলি পেতে এমন বাগ্বিতণ্ডা নিত্যদিনের। ট্রলিতে রোগী উঠলেই গুনতে হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, নিচে পরীক্ষা করতে গেলে যার ট্রলি তাকে ১০০ টাকা দেয়া লাগে। এ ছাড়া রোগী সুস্থ হোক বা না হোক, নাশতা খাওয়ার টাকা দিতে হবে।রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, ট্রলিতে আসা-যাওয়াসহ বিছানার চাদর পাওয়া,পরিষ্কার করানো থেকে শুরু করে যে কোনো বিনামূল্যের সরকারি সুবিধা ভোগ করতে টাকা দিতে হয় একদল স্বেচ্ছাসেবক নামধারীদের। আর সরকারি স্টাফরা দুর্ব্যবহার করেন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে। রোগী ও স্বজনরা বলেন, ২০০ টাকা দিতেই হবে। না হলে তারা এমনভাবে রোগীকে টান দেয় যে রোগীর মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা এসব কর্মী ছড়িয়ে আছেন হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই কাজের বিনিময়ে খুশি হয়ে যা দেয় সেটাই তারা নেয়। স্বেচ্ছাসেবকরা বলেন, ‘আমরা জোর করে টাকা নেই না। রোগীকে পৌঁছে দিলে স্বেচ্ছায় কিছু টাকা তারা দেন। সেগুলো নিয়ে থাকি।হাসপাতালের বিভিন্ন শাখায় এসব নামধারী স্বেচ্ছাসেবক আছেন অন্তত ২৫০ জন। চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মী সংকট থাকায় স্বেচ্ছাসেবক নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাহিদার অর্ধেকেরও কম পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী, স্বজনসহ কর্মচারীরা। সংকট নিরসনে স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। লিফটে পানি নিয়ে ওঠা যাবে না। তাই ৫তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে বালতিতে পানি নিয়ে উঠছেন ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। প্রতিনিয়ত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমন চিত্র। শুধু তিনিই নন, পানির নিদারুণ কষ্টে আছেন তিন তলার সার্জারি নারী ওয়ার্ডের চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের পাশে থাকা স্বজনরা। হাসপাতালের প্রতিটি ফ্লোরে পানিসংকটের ভোগান্তি সইতে হচ্ছে তাদের। মাসখানেক ধরে হাসপাতালের আনসার কোয়ার্টারে পানির সংকট পৌঁছেছে চরমে। দিনে দুবার যে পানি দেয়া হচ্ছে, তা-ও আবার ব্যবহার অনুপযোগী। বারবার বলা সত্ত্বেও মিলছে না কোনো স্থায়ী সমাধান। শেবাচিমের আনসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২ ঘণ্টা পানি থাকে; সেটাও দুগন্ধযুক্ত ও ময়লা। এখানে খাওয়ার মতো পানি নেই।প্রতিদিন হাসপাতালে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষার্থী, স্টাফ, আনসার ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ৫ থেকে ৬ লাখ গ্যালন পানি ব্যবহারের চাহিদা রয়েছে। অথচ মাত্র দুটি সেন্ট্রাল পাম্পের মাধ্যমে ট্যাঙ্কে পানি উঠানো হয় মোট চাহিদার অর্ধেকেরও কম।বরিশাল গণপূর্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী বলেন, এখানে যে পানি সরবরাহের সিস্টেম; এটা ১৯৬৮ সালে যেভাবে চলত এখনো ঠিক সেভাবে চলছে। কোনো আপডেট করা হয়নি।রোগীদের চাপ বাড়লেও সে অনুযায়ী পানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়েনি।

যাত্রীবোঝাই লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের উদ্ধার করে পাঠানো হয় বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে হাসপাতালের বার্ন ইউনিট বন্ধ থাকায় চিকিৎসা চলে সার্জারি বিভাগে। একসঙ্গে এত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
প্রায় ৫ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ। এর ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ নামে লঞ্চে অগ্নিদগ্ধ ৭২ জন রোগী।রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, সার্জারি বিভাগে অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সরাই রোগীদের একমাত্র ভরসা। হাসপাতালটির বার্ন ইউনিট বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন দগ্ধ রোগীরা। সার্জারি ওয়ার্ডের আগে থেকে অনেক রোগী ভর্তি থাকায় দগ্ধদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ সালের ১২ মার্চ হাসপাতালের নিচতলায় আটটি শয্যা নিয়ে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ চালু করা হয়েছিল। বিভাগে আটজন চিকিৎসক ও ১৬ জন নার্সের পদ রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউনিটটি ৩০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। চালু থাকা পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি রোগী বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়েছেন।শেবাচিমের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. এমএ আজাদের রহস্যজনক মৃত্যুর পর ইউনিটটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের মেশিনগুলোর অর্ধেকেরও বেশি অচল। ব্যক্তি মালিকানার ল্যাবের সঙ্গে হাসপাতালের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট জড়িত থাকায় বছরের পর বছর পার হলেও সরকারের ডায়াগনস্টিক মেশিন সচল হচ্ছে না। এতে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ বেশি রোগী নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে চিকিৎসাসেবা। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটির একমাত্র এমআরআই মেশিনটি ২০০৭ সালে চালু হয়। ৯ বছর কোনোমতে চললেও, গত ৬ বছর ধরে বিকল। এছাড়াও হাসপাতলের একমাত্র সিটি স্কান মেশিনটি চালু হয় ২০১৪ সালে। গত ৪ বছর ধরে বন্ধ। আরও জানা গেছে, হাসপাতালের ২২টি ইউনিটি মোট ৪৫০টি মেশিনের মধ্যে পুরোপুরি অচল ৮৫টি আর মেরামতযোগ্য আছে ৭৪টা মেশিন। সচল রয়েছে ২৯১টি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সরকারি মেশিনগুলো যখন অচল, তখন হাসপাতালের আশপাশে একের পর এক গড়ে উঠছে ব্যক্তি মালিকানার ল্যাব। রোগীদের অভিযোগ, সরকারি মেশিন নষ্টের অজুহাত দেখিয়ে বেশি টাকায় বাধ্য করা হয় বাইরের ল্যাবে পরীক্ষা করাতে। এসব ল্যাবের সঙ্গে হাসপাতালের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অথচ ধারণ ক্ষমতার প্রতিদিন তিনগুণ বেশি রোগী সেবা নেয় এই হাসপাতাল থেকে।

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) করোনা ওয়ার্ড থেকে ১শ’ অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং ৩০টি সিলিন্ডার মিটার উধাও হয়ে গেছে।
এ ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সন্ধান চালিয়ে উধাও হওয়া কোন সিলিন্ডার উদ্ধার করতে পারেনি তারা। মেডিকেলের স্টোর সূত্র জানায়, করোনা ওয়ার্ডের ওয়ার্ড মাস্টারদের মাধ্যমে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও সিলিন্ডার মিটার সরবরাহ করা হয়। কোন ওয়ার্ডে কতটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও সিলিন্ডার মিটার নেয়া হয়েছে তার তালিকা করা হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন ওয়ার্ড তল্লাশি করে অন্তত ১শ’ সিলিন্ডার ও ৩০টি সিলিন্ডার মিটারের হদিস পাওয়া যায়নি। নন কোভিড ওয়ার্ডেও সেগুলোর খোঁজ মেলেনি। বিষয়টি পরিচালককে অবহিত করা হলে তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দল সকাল সোয়া ৯টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে গিয়ে বেশিরভাগ শিক্ষককে (চিকিৎসক) অনুপস্থিত পেয়েছেন। পরে ডা. মনিরুজ্জামান শাহিনের কাছে চিকিৎসকদের গত এক সপ্তাহের বায়োমেট্রিক হাজিরা রিপোর্ট দেখতে চাইলে অধ্যক্ষ দিতে অস্বীকার করেন। এ নিয়ে দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অধ্যক্ষের বাদানুবাদ হয়েছে।সকাল ৮টায় কর্মস্থলে হাজিরার কথা থাকলেও বরিশাল মেডিকেল কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষক ১০টার পরে কর্মস্থলে যান। তাঁরা রাত ২-৩টা পর্যন্ত প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখেন। বিশেষ করে নিউরোলজি মেডিসিনের ডা. অমিতাভ সরকার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় দুদক কর্মকর্তারা মেডিকেল কলেজে অভিযান চালান। এ দিনও এই দুই চিকিৎসককে সকাল সাড়ে ৯টায় কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি।বরিশাল দুদকের সহকারী পরিচালক রাজ কুমার সাহার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি দল সকাল ৯টার দিকে প্রথমে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যায়। দলের সদস্যরা বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে পরিচালকের কক্ষে গিয়ে বসেন। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৯টায় যান অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামানের কার্যালয়ে। তখন তিনি কক্ষে ছিলেন না। দুদক দল আসার খবর পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে কার্যালয়ে পৌঁছান। তাঁর কাছে গত এক সপ্তাহের বায়োমেট্রিক হাজিরা রিপোর্ট চাইলে দিতে অস্বীকার করে তিনি দুদক টিমের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ান। একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দুদক টিমের ছবি তুলে রাখার হুমকি দিচ্ছেন অধ্যক্ষ। তখন দুদকের এক কর্মকর্তা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয় দিলে অধ্যক্ষ পাল্টা বলেন, ‘আমি উড়ে এসেছি নাকি?’ এর কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকরা একে একে অধ্যক্ষের কক্ষে আসা শুরু করেন। তাঁরা সকাল ১০টার দিকে হাজিরা দেন অধ্যক্ষের কক্ষে। সাড়ে ১০টার দিকে দুদক টিম মেডিকেল কলেজ ত্যাগ করে।

মানববন্ধনে বক্তারা হাসপাতালের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি, অকেজো যন্ত্রপাতি চালু, লিফট, এসি সচলসহ দালালের দৌরাত্ম্য রোধের দাবি জানান। তারা চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের সেবা না পাওয়ারও প্রতিবাদ করেন। আর এ জন্য হাসপাতালে হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন গঠনের তাগিদ দেন। রেহানা বেগমের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে প্রধান বক্তা বেসরকারি সংস্থা স্কোপ এর নির্বাহী পরিচালক কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, ‘শেবাচিম হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে সেবা থেকে রোগীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের এখানে চিকিৎসা হচ্ছে না। তাদের ঢাকায় রেফার করা দুঃখজনক। এমনটাই যদি করতে হয়, তাহলে বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা কি করেন।’ তিনি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন গঠনের তাগিদ দেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
শীর্ষনিউজ: আওয়ামী আমলে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটায় কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। সে সময়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাইন্স হাউজের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। তারপরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৭৬ কোটি টাকার আরেকটি কাজ এই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ছক সাজিয়েছিল একই দুর্নীতিবাজ চক্র। তবে কারসাজি করে সাইন্স হাউজকে কাজ দেওয়া হচ্ছেÑ এমন তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। একই লটে ৭০৩ ধরনের পণ্য বিএনপি আমলে এবার বাতিল হওয়া সেই দরপত্রের একই কারসাজিতে আবারও নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ক্রয় তালিকায় একই লটে অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে টেলিভিশন, ঘড়িসহ ৭০৩ ধরনের পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) পরিপন্থি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এই বিষয়ে প্রথমবার দরপত্র আহবান করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণির পণ্য একত্রে রাখার কারণে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। একাধিক প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগে নিম্নমানের স্পেসিফিকেশন, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেল উল্লেখ, মাত্র দুই বছরের ওয়ারেন্টি এবং উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বদলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন গ্রহণযোগ্য করার মতো শর্তের কথা বলা হয়। এই পটভূমিতে তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর দরপত্রটি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ নতুন আহ্বান করা দরপত্রে আগের একই ধরনের শর্ত বহাল রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত মাসের ৬ এপ্রিল দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল। এতে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। দরপত্রে নেই গুণগত মান, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত দরপত্রের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই লটে তালিকায় সিসিইউ বেড, কার্ডিয়াক মনিটর, হিমোডায়ালাইসিস মেশিন, অ্যানেসথেশিয়া যন্ত্র, এক্স-রে ইউনিটের পাশাপাশি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, জেনারেটর, এমনকি টেলিভিশন ও ঘড়িও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত বৈচিত্র্যময় পণ্য এক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে কোনো একক প্রতিষ্ঠান সব সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে না। এতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া দরপত্রে অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে গুণগত মান, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত নেই। ভারী ও সংবেদনশীল চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যেখানে সাধারণত পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি চাওয়া হয়, সেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র দুই বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি সম্পর্কিত সুস্পষ্ট শর্ত না থাকলে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সরবরাহ ও স্থাপনের পরপরই ওয়ারেন্টি কার্যকর হওয়ায় দক্ষ জনবল না থাকলে অনেক যন্ত্র ব্যবহার না করেই ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে, যা সরকারি অর্থের অপচয়। অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, দরপত্রে কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, মডেল, উৎপত্তিস্থল ও কোড উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অন্যান্য যোগ্য সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয়। দেশের অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেখানে পরীক্ষিত উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে কম পরিচিত ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক কেন, তা স্পষ্ট নয়। ‘পিপিআর’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হাসপাতালের কারিগরি কমিটির দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির অদক্ষতা বা সীমাবদ্ধতার কারণে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনার পথ সুগম হয়েছে। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেইন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের সহকারী প্রকৌশলী মাইনুর শুভ বলেন, এক লটে ৭০৩ ধরনের পণ্য কেনা পিপিআরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাতিল হওয়ার পর নতুন করে বিধি মেনে দরপত্র আহ্বান করা উচিত। এর আগে ব্লাড ব্যাংক ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি কেনায় প্রায় ৯৬ কোটি টাকার ৯টি দরপত্র আহবান করা হয়। সব কাজ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে পরে অভিযোগ ওঠে, নিম্নমানের পণ্যে বিদেশি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের দরপত্র প্রক্রিয়া উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। এতে ভবিষ্যতে নিরীক্ষা আপত্তি ও দুর্নীতির মামলার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের পরামর্শ, প্রয়োজনভিত্তিক আলাদা লটে বিভাজন করে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা না হলে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হবে। প্রকল্প পরিচালক এস এম কবির হোসেন বলেন, দরপত্র আহবান করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। বাতিল হওয়া দরপত্রের শর্তেই কেন নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলো- জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাসপাতালটিকে জিম্মি করে রেখেছে আওয়ামী দুর্নীতিবাজ চক্র পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রকল্পে আওয়ামী সরকারের আমলে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। ৯টি প্যাকেজে প্রায় ১০৫ কোটি টাকার কেনাকাটা হয়। নানা রকমের অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ৯টি প্যাকেজেরই কার্যাদেশ দেওয়া হয় বহুল আলোচিত, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আওয়ামী ঠিকাদার বাংলাদেশ সায়েন্স হাউজকে। কিন্তু দুই বছর আগে বিল পরিশোধ করলেও সেইসব মালামাল এখনো পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে, তাতে ইউরোপ-আমেরিকার স্টিকার ও সিল ব্যবহার করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই একই ঠিকাদারকে আবারও ৭৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছিল। টেন্ডারের শুরুতেই ভয়াবহ রকমের অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। পিপিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা এক্ষেত্রে চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়। টেন্ডারের এসব গুরুতর অনিয়মকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দেওয়া হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিত নির্দেশও দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু তারপরও দুর্নীতিবাজচক্রের তৎপরতা থামেনি। এর কারণ হলো, তদন্তের পরে টেন্ডার বাতিল হলেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রত্যেকেই বহাল-তবিয়তে রয়ে গেছেন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশাল নগরীর একসময়ের আস্থার প্রতীক হেমায়েত উদ্দিন ডায়াবেটিক হাসপাতাল এখন যেন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা.মানবেন্দ্র সরকার—যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল নগরীর হেমায়েত উদ্দিন ডায়াবেটিক হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মানবেন্দ্র সরকার। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পরও তিনি এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মকর্তাদের অবসরের বয়সসীমা ৬২ বছর নির্ধারণ করা হলেও ডা. মানবেন্দ্র সরকারের বর্তমান বয়স ৭৪ বছর বলে জানা যায়। বয়সসীমা পেরিয়েও দায়িত্বে বহাল হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বরের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৬২ বছর এবং কর্মচারীদের জন্য তা ৬৫ বছর নির্ধারণ করা হয়। অথচ বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মানবেন্দ্র সরকারের বয়স ৭৪ বছর—যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অন্তত ৯ বছর বেশি। নিয়ম অনুযায়ী বহু আগেই তার দায়িত্ব ছাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুপারিশের মাধ্যমে তিনি তার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন। এমনকি ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর তিনি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় একই পদে বহাল হন। রাজনৈতিক ভারসাম্যের কৌশল ডা. মানবেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো—তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সময়োপযোগী সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেন। আওয়ামী লীগ আমলে স্বাচিপ নেতা হিসেবে পরিচিত থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।উল্লেখ্য যে ‘এই হাসপাতালে তার চাকরি হয়েছিলো আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর সুপারিশে। ২০২৩ সালে ২০ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব থেকে নিজেই অব্যহতি নিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর খোকন সেরনিবায়াত ও এমপি শাহজাহান ওমরের সুপারিশ নিয়ে আবার স্ব-পদে বহাল হন। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড. মজিবর রহমান সরোয়ারেরও সুপারিশ আনেন তার চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য। অভিযোগ রয়েছে মানবেন্দ্র তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার কারনে হিন্দু সম্প্রদায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছেন। ডা: মানবেন্দ্র সরকারের খামখেয়ালীপনার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন হাসপাতালের অফিস সহায়ক আনিসুর রহমান। এর আগেও তার কথা মতো না চলায় বেশ কয়েকজনকে তিনি বিনা নোটিশে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। ৫ আগষ্টের পর ভোলপাল্টে তিনি এখন বিএনপি নেতা। হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানায়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থানকে “অপরিহার্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভিযোগ: দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের কিছু সদস্য ও কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে গত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অথচ কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের সময় নিয়মিতভাবে “টাকা নেই” বলে জানানো হয়। এই বৈপরীত্য কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বিভিন্ন ক্রয়-বিক্রয়, নিয়োগ এবং সেবামূলক খাতে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বচ্ছ তদন্ত এখনো দৃশ্যমান নয়। ভয় ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি হাসপাতালের ভেতরে ভয়ের একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মচারী। তারা জানান, তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশ অমান্য করলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকে। সম্প্রতি আনিসুর রহমান নামের এক অফিস সহায়ককে কোনো লিখিত অভিযোগ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, ব্যক্তিগত অসন্তোষ থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগেও একই ধরনের ঘটনায় কয়েকজন কর্মচারীকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্যের অভিযোগ কিছু কর্মচারীর দাবি, নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের সদস্যরা প্রশাসনিক সুবিধা বেশি পাচ্ছেন। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত হয়নি, তবুও এটি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে। ক্ষোভে ফুঁসছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্রমাগত অনিয়ম, বেতন সংকট এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার কারণে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত তত্ত্বাবধায়ক অপসারণের দাবি জানিয়েছেন এবং একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন রয়ে যায় একজন ব্যক্তি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম ভেঙে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন—এই প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। হেমায়েত উদ্দিন ডায়াবেটিক হাসপাতালের মতো একটি জনস্বাস্থ্যকেন্দ্র যদি অনিয়ম ও প্রভাবের বলয়ে আটকে পড়ে, তবে এর প্রভাব পড়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবার ওপর। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে। কর্তৃপক্ষের নীরবতা এ বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) ঘিরে আবারও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী ও দমন-পীড়নে জড়িত একাধিক কর্মচারী এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক ভোল পাল্টে বিএনপি বা জামায়াতপন্থী পরিচয় ধারণ করলেও বাস্তবে আগের প্রভাব-প্রতিপত্তি অটুট রয়েছে বলে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। হাসপাতাল সূত্র জানায়, সম্প্রতি চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের একটি কমিটি অনুমোদনের লক্ষ্যে একটি মহল বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার-এর দ্বারস্থ হয়। তাদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আপত্তি থাকায় তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে তারা বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লা-এর মাধ্যমে কমিটি অনুমোদন করান। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির শীর্ষে দু-একজন বিএনপিপন্থী থাকলেও অধিকাংশ সদস্যই ঘোর আওয়ামীপন্থী। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ওয়ার্ড মাস্টার মশিউল আলম মল্লিক ওরফে ফেরদৌস। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১ মার্চ ঔষধ চুরির সময় যৌথবাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। এ ঘটনায় তৎকালীন উপ-পরিচালক ডা. সুভাষ দাশ কোতোয়ালি থানায় এজাহার (নং-৩২৫৯/০৭) দায়ের করেন। সেখানে প্রায় ৩০ লক্ষাধিক টাকার ঔষধ চুরির অভিযোগ উল্লেখ ছিল। তবে পরবর্তীতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ-এর হস্তক্ষেপে অভিযোগ থেকে রেহাই পান বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালে করোনা ওয়ার্ড থেকে ১০০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার চুরির অভিযোগও ওঠে ফেরদৌসের বিরুদ্ধে। তৎকালীন সহকারী পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান শাহীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললেও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ-এর হস্তক্ষেপে তা আলোর মুখ দেখেনি। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার বদলির আদেশ এলেও তা কার্যকর হয়নি। বরং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত ছিল। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ৩ আগস্ট চৌমাথা এলাকায় বিএনপি নেতা জিয়া শিকদারের ওপর হামলার সময়ও তাকে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়ার্ড মাস্টার মশিউল আলম ফেরদৌস। তিনি বলেন, “আমাকে যৌথবাহিনী আটক করেছিল, এটা সত্য। তবে মামলায় আমি খালাস পেয়েছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অন্যান্য অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তিনি অভিযোগগুলো তদন্তের দাবি জানান। এ বিষয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) বরিশাল জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও শেবাচিম হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আব্দুল মোনেম সা’দ বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর বলেন, “বিতর্কিত কয়েকজনের ডিউটি পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে জনবল সংকট থাকায় তাদের দিয়েই সেবা চালাতে হচ্ছে। ডিজি হেলথ থেকে জনবল পরিবর্তন করা হলে সেবার মান আরও উন্নত হবে।” হাসপাতাল ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বিতর্কিত ব্যক্তিরা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকেন—সে বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।